আজ কথা বলব এই সিরিজের গল্পের পেছনের অনুপ্রেরণাগুলো নিয়ে
মুভি রিভিউ

আজ কথা বলব এই সিরিজের গল্পের পেছনের অনুপ্রেরণাগুলো নিয়ে

আজ পাক্কা দুইমাস পর লিখতে বসলাম! আগেই বলে নেই এটা কোন গতানুগতিক রিভিউ পোস্ট না। আজকে একটু ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটতে মন চাইল! তাই লিখলাম কোথাও ভূল ত্রুটি হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন! আজ লিখবো বাংলাদেশের সব থেকে পপুলার নেটফ্লিক্স সিরিজ নিয়ে। সিরিজের নাম La Casa De Papel, যা Money Heist নামেই বহুল পরিচিত।

প্রথমেই বলে নেই, আমার অন্যান্য লেখার মতো আজ এই সিরিজের গল্পের বিশ্লেষণে খুব বেশি সময় নষ্ট করব না। আজ কথা বলব এই সিরিজের গল্পের পেছনের অনুপ্রেরণাগুলো নিয়ে। কথা বলব এমন কিছু বিষয় নিয়ে যা এই সিরিজকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়।

আসুন আলোচনা শুরু করা যাক ‘বেলা চাও’ গানটি নিয়ে। এই গানটা সিজন ১-২ এ বেশ কয়েকবার ব্যবহার করা হয়েছে। এমন কোন মানি হাইস্ট ফ্যান নেই, যারা এই গান গুন গুন করে গাননি। এই গানের হুবহু সুরে কিছু হাস্যকর হিন্দী ও বাংলা রিমেকও রয়েছে।

তবে এই সিরিজকে বুঝতে হলে আমাদের এই গানের ইতিহাস নিয়ে ঘাটতে হবে।

“বেলা চাও” একটা ইতালিয়ান ফ্রেজ, যার অর্থ “বিদায় সুন্দরী।” (Goodbye Beautiful) এই গানটি মূলত একটি ইতালিয়ান লোকসংগীত, যার জন্ম ১৯০০ সালের দিকে। ইতালির উত্তরে কিছু আবাদী জমি ছিল যেখানে ময়লা ও আগাছা পরিষ্কার করার কাজে নিযুক্ত করা হতো মহিলাদের। তাদের আঞ্চলিক ভাষায় “মন্ডিনা” বা “ময়লা পরিষ্কারকারী” বলা হতো।

জমির মালিকদের এই মহিলাদের প্রতি আচরণ ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর। দৈনিক ১৫-১৬ ঘন্টা কাজ করানো হতো তাদের দিয়ে। রোদে পুড়ে, খালি পায়ে অনেক কষ্ট করে কাজ করতেন তারা। সেই তুলনায় ন্যায্য মূল্য দেয়া হতো না তাদের। সেসময়ই অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্যে অজ্ঞাত কোন এক নারী জন্ম দেন এই মহাকাব্যিক গানের। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, আমরা এখন যেই ‘বেলা চাও’ শুনি, ১৯০০ সালের ‘বেলা চাও’ গানের কথাগুলো এমন ছিল না।

জমির মালিকদের অমানুষিক অত্যাচারের কথা ফুটে উঠেছিল সেই গানে। পুরো গানে নীপিড়নের কথা থাকলেও গানের শেষ লাইনগুলোতে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল যে একদিন তারা এই অত্যাচার থেকে মুক্তি পাবে, একদিন আগুনের দিন শেষ হবে।

মূলতঃ তখন থেকেই ইতালির বিভিন্ন মানুষের কাছে এই গানটি প্রতিবাদের গান হয়ে উঠে। সময়ের সাথে সাথে এই গানের সুর একই থাকলেও, কথা পরিবর্তন হতে থাকে। তবে এই গানের ইতিহাসে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৪৩-১৯৪৫ এর মধ্যে ইতালির পার্টিসান গোষ্ঠীর মধ্যে এই গান খুব জনপ্রিয়তা পায়।
এখন প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে এই পার্টিসান কারা?

একটু ইতিহাস ঘাঁটা যাক, চলুন

আমরা সবাই হিটলার আর মুসোলিনিকে চিনি। হিটলার ছিলেন জার্মানির একনায়ক। মুসোলিনি ছিলেন ইতালির। ইতালিতে ফ্যাসিজমের প্রবক্তা ছিলেন এই মুসোলিনিই। মজার ব্যাপার হল, ইতালির অনেক জনগণই কিন্তু মুসোলিনির পক্ষে ছিলেন না। তবে তা সত্ত্বেও মুসোলিনির সিদ্ধান্তে, ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে ইতালিও জার্মানির সাথে যোগ দেয়।

তবে ধীরে ধীরে ১৯৪৩ সালের দিকে এসে ইতালি খুব দুর্বল হয়ে পড়ে এবং যুদ্ধ করার ক্ষমতা হারাতে থাকে। তখন উপায় না দেখে তৎকালীন ইতালির রাজা মুসোলিনিকে গ্রেফতার করেন। আর ইতালি এলিট ফোর্স (আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া) এর কাছে আত্মসমর্পনের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে তারা গোপনে এই শান্তি চুক্তি করতে চেয়েছিল। ইতালি চায়নি জার্মানি এই ব্যাপারে জানুক।

জার্মানি উল্টো ইতালির উপর আক্রমণ

কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। হিটলার এই ব্যাপারে জেনে যায় এবং রেগে গিয়ে জার্মানি উল্টো ইতালির উপর আক্রমণ করে। ব্যাপারটা এমন দাঁড়ালো, যেই দেশ এতোদিন হিটলারের সাহায্য করেছে, সেই দেশেরই বিভিন্ন জায়গা আক্রমণ করছে খোদ হিটলারই। ইতালির অনেক এলাকার দখলও নিয়ে নেয় জার্মান সৈন্যবাহিনী।

এতে ইতালির এক গোষ্ঠী প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে যায়। আর তারাই হল পার্টিসান জনগোষ্ঠী। তারা একটি আন্দোলন গড়ে তোলে যা ইতিহাসে ‘Italian Resistance Movement’ নামে পরিচিত। রেসিট্যান্স অর্থ ‘প্রতিহত করার ক্ষমতা’। এই রেসিস্ট্যান্স শব্দটা মানি হাইস্ট সিরিজে অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

এই আন্দোলন ছিল রক্তক্ষয়ী আন্দোলন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রায় সত্তর হাজার পার্টিসানকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়, ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে যাওয়ার জন্য। এই রেসিস্ট্যান্স আন্দোলনের আইকনিক গান ছিল ‘বেলা চাও’। ১৯৪৩-৪৫ সালের মধ্যেই মূলতঃ বর্তমান লিরিক সম্বলিত ‘বেলা চাও’ গানের সৃষ্টি।

এই গানের কিছু লিরিক গুলোর অর্থ দাঁড়ায়,

” একদিন আমি সকালে জেগে উঠলাম,
উঠে দেখি আমার দেশ শত্রু দ্বারা ছেয়ে গেছে,
বিদায় সুন্দরী,,, 
আমি যুদ্ধে যাচ্ছি!
যদি আমি পার্টিসান হিসেবে শহীদ হই,
পাহাড়ের ওপর, ফুলের ছায়ায়, আমাকে কবর দিও।”

এখন বলেন তো আমি এই গানের বিস্তর ইতিহাস কেন লিখলাম? কারণ মানি হাইস্টের পরিচালক (এলেক্স পিনা) এই গান থেকেই গোটা সিরিজ তৈরীর অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। আমরা যারা সিরিজটাকে খুব সাধারণ একটা ব্যাংক ডাকাতির গল্প মনে করি, ব্যাপারটা আসলে তা নয়! প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে, একটা ইতালিয়ান লোকসংগীত কীভাবে একতা স্প্যানিশ টিভি সিরিজের অনুপ্রেরণা হয়?

উত্তরটা ‘টোকিও’ দিয়ে দেয় সিরিজের প্রথমদিককার এপিসোড গুলোতে।

তার কিছু ডায়লগ ছিলঃ ” প্রফেসরের জীবন একটা বিন্দুকে কেন্দ্র করে ঘুরছিল। সেই বিন্দুর নাম, রেসিস্ট্যান্স।”
সে আরও বলে, “প্রফেসরের দাদা ছিলেন একজন পার্টিসান। যিনি লড়াই করেছিলেন ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে। তিনি প্রফেসরকে বেলা চাও গানটা শিখিয়েছিলেন। আর প্রফেসর সেই গানটা শেখাচ্ছেন আমাদের।”

এখানে গান শেখানো বলতে ব্যাংক ডাকাতি করা শেখানো বুঝানো হয়েছে। তাহলে এখানে আরেকটা প্রশ্ন আসে, ব্যাংক ডাকাতির সাথে রেসিস্ট্যান্সের কী সম্পর্ক? চুরির সাথে আন্দোলনের কী সম্পর্ক? বেলা চাওয়ের কী সম্পর্ক?
সম্পর্ক আছে।

আমরা যদি প্রথম ডাকাতির ধরনের দিকে নজর দেই, তাহলে দেখতে পাব, তারা ব্যাংক থেকে কোন টাকা চুরি করে না। তারা উল্টো ব্যাংকে গিয়ে, হোস্টেজদের না মেরে জিম্মি রেখে, নিজেরা নিজেদের টাকা ছাপিয়ে নিয়ে পালাতে চায়।

আবার পুরো ডাকাতিজুড়েই তারা সাধারণ পাবলিকদের সাপোর্ট পায়। যেন অনেকটা সেই ফ্যাসিজম বিরোধী আন্দোলনের মতো! ফ্যাসিজম বিরোধী আন্দোলনে পার্টিসানরা লড়ছিল ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে। এখানে ডাকাতরা লড়ছে পুঁজিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে।

আরো পড়ুন,

শেষ দশকের বেস্ট মিউজিক্যাল ড্রামা ফিল্ম ফর বলিউড।

সিনেমাটোগ্রাফি এবং বিজিএম – সবকিছু মিলিয়ে পারফেক্টলি ব্যালান্সড

ভয়ংকর অশরীর একটি রাত!

আচ্ছা বাবা, মা আর রাকিব আঙ্কেল দরজা আটকিয়ে কী করে?

এ্যাকশন বা এন্টারটেইনিং মুভির নাম নিলেই প্রথমে নাম আসবে তামিল, তেলেগু মুভি

যেই সরকার আইন তৈরী করলেও, নিজে আইন মানে না। যেই সরকার স্বার্থ হাসিলের জন্য আইনের বাইরে গিয়ে এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং এও পিছপা হয় না। আমরা যদি ক্যারেক্টারগুলোর দিকে তাকাই, তাহলে দেখব, প্রায় প্রত্যেকেই সরকারের অন্যায়ের স্বীকার। হয় ডাকাতির সময়, নাহয় ডাকাতির আগে।

সিরিজের শুরুতেই টোকিওর বয়ফ্রেন্ডকে গুলি করে মেরে ফেলে পুলিশ।(এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং)
টোকিওর মা কে পুলিশ ফাঁদ হিসেবে রাখে, যাতে তাকে গ্রেফতার করা যায়। প্রফেসরের বাবা মারা যায় একটা ডাকাতির সময়। এটাও এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং।

ডেনভার তার বাবাকে ছাড়া বড় হয়েছে, কারণ তার বাবা জেলে ছিল। সরকার তাকে সঠিক শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করেনি। ডাকাতির সময়, অন্য দেশের এক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার মেয়েকে বাঁচানোর জন্য, পুলিশ সাধারণ হোস্টেজদের বিপদে ফেলতেও পিছপা হয় না।

সরকার আইনের বাইরে গিয়ে রিও কে অমানুষিক অত্যাচার করে

ফোর্থ সিজনে, ইন্সপেক্টর রাকেলকেও তার মেয়ে আর মায়ের ভয় দেখিয়ে কাস্টোডিতে জেরা করা হয়েছে।
সর্বোপরি, নাইরোবি আর তার ছেলের মর্মান্তিক গল্প তো সবাই জানি। এরকম সিরিজজুড়ে আরও ছোট ছোট ঘটনা, যা বোঝায় যে আমাদের সিস্টেমে, সরকার ব্যবস্থায় এতোবেশি ফাঁক-ফোঁকর রয়েছে যে তারাও কোন অংশে ডাকাতদের থেকে কম না, খুনী হতেও যেন সরকারের বাঁধা নেই। সিরিজে আরেকটা সত্য ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।

আসুন এই ঘটনাটা একটু ব্যাখ্যা করি

আমরা অনেকেই ছোটবেলায় চিন্তা করতাম, “ব্যাংকেই তো নোট ছাপানো হয়। তাই ব্যাংক যদি বেশি বেশি টাকা ছাপিয়ে গরীব মানুষদের দিয়ে দেয়, তাহলেই তো দেশ থেকে দারিদ্র্য চলে যাবে। আসলে চিন্তাটা ভুল। কারণ GDP এর তুলনায় বেশি অর্থ ছাপানো হলে, দেশের মুদ্রার মান অনেক কমে যাবে। এটা করলে তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান হলেও, সুদূর ভবিষ্যতে এটা ইকোনমিতে খারাপ প্রভাব ফেলবে।

তবে অনেক সময় দেশের জাতীয় ব্যাংকগুলো তাৎক্ষণিক ক্ষতি পুষানোর জন্য এটা করে থাকে। অর্থাৎ তারা এক্সট্রা নোট ছাপায়।এটাকে বলা হয়, ‘লিকুইডিটি ইনিজেকশন।’ ইউরোপিয়ান ব্যাংক এমনই একটা স্ক্যাম করে। যার ফলে তারা কোনকিছুর ভিত্তি ছাড়াই ২০১১ সালে ১৭১ বিলিয়ন ইউরো, ২০১২ সালে ১৮৫ বিলিয়ন ইউরো, ২০১৩ সালে ১৪৫ বিলিয়ন ইউরো আয় করে লিকুইডিটি ইনজেকশনের কথা বলে।

এমনকি ঘাটাঘাটি করলে দেখা যায়, ২০০৮ সালের পর থেকে ইউরোপিয়ান ইকোনমিতে তিন ট্রিলিয়ন ইউরো ইনজেক্ট করা হয়েছে। এই ঘটনার ভিত্তি ধরে প্রফেসরের প্রশ্ন হল, “এখানে সরকার কী ডাকাত নয়? তারা মানি হাইস্টে প্রথম ডাকাতি করে, ছাপাতে পেরেছিল ৯৮৪ মিলিয়ন ইউরো। যেখানে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা লিকুইডিটি ইঞ্জেকশনের নামে ছাপিয়েছিল তিন ট্রিলিয়ন ইউরো!  ৯৮৪ মিলিয়নের ৩০০০ গুণ বেশি!

এজন্যই তারা সাধারণ মানুষের সাপোর্ট পায়

কারণ তারা কারও ক্ষতি করছে না। এই পুঁজিবাদী সরকার যে সিস্টেমে আগাচ্ছে, তারাও সে সিস্টেমেই চুরি করছে। আবার সেই চুরি করা অর্থ এয়ার বেলুন দিয়ে জনগণের মধ্যে বিলিয়ে দিচ্ছে। এজন্যই সিরিজ জুড়ে তাদের নাম রবিনহুড! মানি হাইস্টের ডাকাতরা যেন স্প্যানিশ সরকারের প্রতীক। আর হোস্টেজ রা সাধারণ মানুষের প্রতীক।
এমনকি দালি মাস্ক পরে যে তারা ডাকাতি করে, সেই দালি মাস্কের পেছনেও রয়েছে ইতিহাস।

সালভাদর দালি’ একজন বিখ্যাত স্প্যানিশ আর্টিস্ট ছিলেন। তার জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি আন্দোলন হল “ডাডা মুভমেন্ট”। ১৯১৬ সাল থেকে শুরু এই আন্দোলনেও প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ফুঁটে উঠেছিল পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রতি ক্ষোভ।

এরকম আরও অনেক ছোট ছোট ডিটেইলস রয়েছে পুরো সিরিজ জুড়ে, যা মানি হাইস্টকে অনন্য করে তুলেছে।
যদি শুধুমাত্র “বেলা চাও” গানের কথাই চিন্তা করি, তাহলে দেখা যাবে এই করোনা মহামারীর সময়ও ইতালিয়ান নাগরিক রা বারান্দায় দাঁড়িয়ে একসাথে উচ্চস্বরে এই গান গেয়েছে। যেন হাজারটা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এই গানটাই যথেষ্ট।

মানি হাইস্ট রিলিজের পরে

মানি হাইস্ট রিলিজের পরে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন আন্দোলন হয়েছে দালি মাস্ক পরে, লাল জ্যাকেট পরে। লাল ভালোবাসার প্রতীক, বিপ্লবের প্রতীক, বেদনা ও অত্যাচারের প্রতীক। সর্বোপরি, মানি হাইস্ট যেন বিশ্বজুড়ে হয়ে উঠেছে রেসিস্ট্যান্স এর প্রতীক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রতীক।

স্পেনের কাতালান আন্দোলনেও এই বেলা চাও আর দালি মাস্ক ছিল প্রতীকী! বিভিন্ন ফুটবল ক্লাবের থিম সং হল বেলা চাও! ফ্রান্সেও এক জাতীয় আন্দোলনে ব্যবহার করা হয়েছে এই গানটি। এজন্যই মানি হাইস্ট সিরিজটা শুধুমাত্র মারমার কাটকাট উত্তেজনার জন্য, টোকিওর বোকামির জন্য, প্রফেসরের অসীম বুদ্ধিমত্তা কিংবা তার গুড লুকস এর থেকেও অনেক বেশিকিছু।

আমরা অনেক সময়ই বার্লিন ক্যারেক্টারটাকে উপেক্ষা করে যাই। বার্লিনকে পুরো সিরিজ জুড়েই অহংকারী, আত্মমগ্ন, দুশ্চরিত্র মনে হয়। কিন্তু সিরিজ যতো আগায় আমরা বুঝতে পারি যে সে আসলে প্রফেসরের ভাই। শেষে সে নিজের জীবন দিয়ে ডাকাতি কে সফল করে। তবে বৃহত্তর অর্থে দেখতে গেলে সে শুধুমাত্র ডাকাতিকে সফল করেনি, সে সফল করেছে পুঁজিবাদের বিপক্ষে একটি বিশাল আন্দোলনকে।

সে সফল করেছে একটি মহান শব্দকে, যাকে আমরা বলি “রেসিস্ট্যান্স”

মানি হাইস্ট নিপীড়িত মানুষদের কথা বলে, এই পচন ধরা সমাজব্যবস্থা, রাষ্ট্রযন্ত্রের কথা বলে। হয়তো পৃথিবীর কোন কোণায়, কোন বদ্ধ ঘরে এই সিরিজ জন্ম দিয়েছে বাস্তব জীবনের প্রফেসরকে, যে কিনা বদ্ধপরিকর পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে।

হয়তো পৃথিবীর কোন কোণায়, ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে বেজে উঠছে “বেলা চাও”। অথবা অত্যাচারে পিষ্ট হতে থাকা কোন মানুষ এই গান শুনে আবার বেঁচে থাকার রসদ পাচ্ছে। যতোই এই সিরিজের সমালোচনা করুন না কেন,
আপনাকে মানতে হবে প্রায় 100 বছর পর এই সিরিজ সালভাদর দালি আর বেলা চাও গানকে নতুন পরিচয় দিয়েছে।

আর একবার চিন্তা করে দেখুন তো, সিরিজ দেখার সময় মানি হাইস্টের এক একটা ডাকাতকে যেভাবে আপনি সাপোর্ট করেছেন, নাইরোবি মারা যাওয়ার সময় যেভাবে কষ্ট পেয়েছেন। অন্য কোন সিনেমাতে, কিংবা কোন সিরিজে। আপনি কোন নেগেটিভ ক্যারেক্টারকে এতোটা ভালোবেসেছেন? বাসেন নি।

এটাই এলেক্স পিনার সফলতা, এটাই মানি হাইস্ট এর জাদু। এবছর কিংবা আগামী বছর মানি হাইস্টের শেষ সিজন আসছে। গল্প যাই হোক, যতোই থ্রিল থাকুক, প্রফেসর যতোই কারিশমাই দেখাক লাস্ট সিজনে, আমার কাছে মানি হাইস্টের একটাই প্রতিশব্দ, “রেসিস্ট্যান্স”।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *